সারাদিন আকাশটা ভারী ছিল, যেন কোনো গোপন কথা লুকিয়ে রেখেছে। সন্ধ্যা নামতেই বৃষ্টি পড়া শুরু হলো—প্রথমে হালকা, তারপর ধীরে ধীরে ঘন হয়ে উঠল, পুরো শহরটাকে এক শান্ত ছন্দে ঢেকে দিল।
আরাভ একটা ছোট বাসস্ট্যান্ডের ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল না—সে অপেক্ষা করছিল সময় কাটার, মনের ভেতরের অস্থিরতা কমার, এমন কিছুর জন্য যার নাম সে নিজেও জানত না।
ঠিক তখনই সে এল।
মীরা দৌড়ে এসে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে তার পাশে দাঁড়াল। তার চুল ভেজা, চোখে অদ্ভুত এক উজ্জ্বলতা। সে হালকা হেসে তার ওড়নাটা ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,
“মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ এখানে আটকে থাকতে হবে।”
আরাভ মৃদু হেসে বলল, “হ্যাঁ, তাই মনে হচ্ছে।”
কিছুক্ষণ নীরবতা—অস্বস্তিকর নয়, বরং সম্ভাবনায় ভরা। যেন কিছু নতুন শুরু হতে চলেছে।
ধীরে ধীরে কথাবার্তা শুরু হলো। প্রথমে আবহাওয়া, তারপর দৈনন্দিন জীবন, তারপর সেই সব স্বপ্নের কথা—যেগুলো তারা অনেকদিন কাউকে বলেনি। আরাভ বলল তার সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসার কথা। মীরা বলল, কিভাবে রং আর ছবি তার অনুভূতিকে প্রকাশ করে।
বৃষ্টি আরও জোরে নামছিল, কিন্তু তাদের কারোই সেটা আর খেয়াল ছিল না।
একসময় মীরা হেসে উঠল—একটা নির্মল, প্রাণবন্ত হাসি, যা বাতাসে ভেসে রইল। আরাভ বুঝতে পারল, অনেকদিন পর সে এতটা স্বস্তি অনুভব করছে।
হঠাৎ মীরা জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি কাকতালীয় ঘটনায় বিশ্বাস করো?”
আরাভ একটু ভেবে বলল, “আমি মনে করি, কখনও কখনও জীবন আমাদের ঠিক জায়গায়, ঠিক সময়ে নিয়ে আসে। এরপর আমরা কী করি, সেটাই আসল।”
মীরা তার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, “হয়তো এটা তেমনই একটা মুহূর্ত।”
ধীরে ধীরে বৃষ্টি থেমে এলো। আকাশ পরিষ্কার হতে লাগল, চারপাশে আবার স্বাভাবিক গতি ফিরে এল।
কিন্তু তাদের মধ্যে কিছু একটা বদলে গিয়েছিল।
মীরা যাওয়ার আগে একটু থামল। “আমি সাধারণত এমন করি না,” সে বলল, “কিন্তু… আমরা কি আবার দেখা করতে পারি? হয়তো এবার বৃষ্টি ছাড়া?”
আরাভ হাসল। “আমি চাই।”
তারা নম্বর বিনিময় করল—একটা ছোট্ট কাজ, কিন্তু তাতে যেন অনেক বড় কিছু লুকিয়ে ছিল।
মীরা চলে যাওয়ার পর আরাভ বুঝতে পারল—সে আর শুধু সময় কাটানোর জন্য দাঁড়িয়ে নেই। সে অপেক্ষা করছে, সামনে কী আছে সেটা দেখার জন্য।
কখনও কখনও, একটা বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা আর এক অচেনা মানুষের হাসিই মনে করিয়ে দেয়—জীবন এখনও সুন্দর।
আর কখনও কখনও, ভালোবাসা শুরু হয় একদম অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে।
